যুক্তরাষ্ট্রের উল্টো নীতি বিভক্তির হুমকিতে ইন্টারনেট দুনিয়া

দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার হুমকিতে পড়েছে বিশ্বের ইন্টারনেট ব্যবস্থা। ট্রাম্প আমলে যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া ‘ক্লিন ইন্টারনেট’ নীতি বাস্তবায়িত হলে আক্ষরিক অর্থেই অনলাইন দুনিয়া ‘যুক্তরাষ্ট্র’ ও ‘চীন’- এই দ্বিখণ্ডিত অবস্থার সংকটে পড়ে যাবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ‘ক্লিন ইন্টারনেট’ নীতির বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেবেন, সেটা এখন দেখার বিষয়। কার্যত তার সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে বর্তমানের সমন্বিত ইন্টারনেট ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ।

আন্তর্জাতিক বিশ্নেষকরা বলছেন, ‘ক্লিন ইন্টারনেট’ নীতির কারণে চীনের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনলাইন সার্ভারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপিত হলে চীন সাময়িকভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে; কিন্তু আখেরে লাভ হবে চীনেরই। প্রযুক্তির এই প্রতিযোগিতায় অদূর ভবিষ্যতে চীনের এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। তবে সমন্বিত ইন্টারনেট ব্যবস্থা দ্বিখণ্ডিত হলে মহাসংকটে পড়বে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের মতো ক্রমবর্ধমান অগ্রগতির পথে এগিয়ে যেতে থাকা দেশগুলো। কারণ দ্বিখণ্ডিত ইন্টারনেট ব্যবস্থায় বর্তমান সময়ের চেয়ে ইন্টারনেট এবং অনলাইনভিত্তিক সেবার খরচ বেড়ে যাবে প্রায় দশগুণ।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সমকালকে বলেছেন, বিশ্ব ইন্টারনেট ব্যবস্থা যদি দ্বিখণ্ডিত হয়ও তাতেও বাংলাদেশের অগ্রগতি বন্ধ হবে না। বাংলাদেশ বর্তমানে পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত কী ব্যবস্থা নেয়, তা দেখেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে তিনি মনে করেন, যুক্তিসঙ্গত বিশ্নেষণ করলে, চলমান বিশ্ব ব্যবস্থায় ইন্টারনেট ব্যবস্থা দ্বিখণ্ডিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

‘ক্লিন ইন্টারনেট’ কী: সাধারণভাবে ‘ক্লিন ইন্টারনেট’ হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে ইন্টারনেটে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তার সুরক্ষায় কোনো আশঙ্কা থাকবে না এবং একটি দেশের তথ্যভাণ্ডারে অনাকাঙ্ক্ষিত অনুপ্রবেশেরও ঝুঁকি থাকবে না। সুইজারল্যান্ড ২০১৬ সালে প্রথম এ ধরনের একটি ইন্টারনেট ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানায়। কিন্তু পরে তাদের এই সাধারণ ধারণা আর ‘সাধারণ’ থাকেনি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘ক্লিন ইন্টারনেট’ নীতি শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছে ‘চীনমুক্ত’ ইন্টারনেট ব্যবস্থা।

চলতি বছর জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম ‘ক্লিন ইন্টারনেট’ নীতি অনুসরণের ঘোষণা দেয়। শুরুতেই তারা চীনা তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানি হুয়াওয়ের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে। গত আগস্টে ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেই এক সংবাদ সম্মেলনে এই ক্লিন ইন্টারনেট নীতি আরও স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, ‘ক্লিন ইন্টারনেটে’র অর্থ হচ্ছে ‘চীনমুক্ত’ ইন্টারনেট ব্যবস্থা। এই নীতির বাস্তবায়ন শুরু হলে চীনা কোম্পানির তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিচালিত নেটওয়ার্ক থেকে কোনো ডাটা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সার্ভারে ঢুকতে পারবে না। অর্থাৎ যেসব দেশে চীনের হুয়াওয়ে কিংবা জেডটিইর যন্ত্রপাতি টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কে ব্যবহূত হচ্ছে, সেসব দেশ থেকে কোনো ডাটা যুক্তরাষ্ট্রের ফেসবুক, গুগল, মাইক্রোসফট কিংবা অ্যামাজনের সার্ভারে ঢুকতে পারবে না। ইন্টারনেট ব্যবস্থাকে নিরাপদ করতেই ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ চীনা প্রযুক্তি বাদ দেওয়ার এই নীতি নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন মাইক পম্পেই।

তার এই বক্তব্যের পর পুরো বিশ্বের ইন্টারনেট ব্যবস্থা দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। বিবিসির তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক বিশ্নেষক জেমস ক্লেটন তার নিবন্ধে লিখেছেন, এই অবস্থার সৃষ্টি হলে চীন স্পষ্টতই নিজস্ব একটি ইন্টারনেট ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইবে। সেক্ষেত্রে বিশ্ব ইন্টারনেট ব্যবস্থা ‘যুক্তরাষ্ট্র’ এবং ‘চীন’- এই দুই ভাগে বিভক্ত হবে। যদি দুটি ব্যবস্থার মধ্যে আন্তঃযোগাযোগের কোনো সুযোগ না থাকে তাহলে পুরো অনলাইন দুনিয়া এক ধরনের বিচ্ছিন্নতার মধ্যে পড়বে। যারা যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারনেট ব্যবস্থায় থাকবে তারা চীনের ইন্টারনেট ব্যবস্থার কিছুই জানতে পারবে না। একইভাবে চীনের ইন্টারনেট ব্যবস্থায় যারা থাকবে, তাদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারনেট ব্যবস্থা পুরোপুরি অচেনা হয়ে যাবে।

খ্যাতনামা তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ জন চিপম্যান বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে নিজের বিশ্নেষণ তুলে ধরে বলেছেন, যদি বিশ্ব ইন্টারনেট ব্যবস্থা দ্বিখণ্ডিত হয় তাহলে চীন সাময়িকভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও কম সময়ের মধ্যে তারাই এগিয়ে যাবে। কারণ চীনা কোম্পানি হুয়াওয়ে এককভাবে সম্পূর্ণ ‘টেলিযোগাযোগ ইকো সিস্টেম’ তৈরি করেছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক, ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক থেকে শুরু করে যাবতীয় ডিভাইস তাদের হাতে আছে। এখন তারা স্মার্ট ফোনের বিকল্প অপারেটিং সিস্টেমও দুনিয়ার সামনে নিয়ে এসেছে। দ্বিখণ্ডিত ব্যবস্থার মধ্যে পড়ে গেলে তারা বিকল্প কম্পিউটিং অপারেটিং সিস্টেমেও চলে যাবে। এ ছাড়া চীনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম উইচ্যাট, টিকটক খুব দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। আলিবাবার অবস্থানও অ্যামাজনের সঙ্গে সমানে-সমান। সবচেয়ে বড় কথা, চীনা পণ্যের সাশ্রয়ী মূল্যের কারণে স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে তারাই প্রাধান্য পাবে। ফলে দিনশেষে ক্ষতির শিকার হবে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোই। গত এক দশকে স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার প্রায় পুরোটাই গড়ে উঠেছে চীনা কোম্পানিগুলোর ইকো সিস্টেমের ওপর। ফলে তাদের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবস্থায় যাওয়ার জন্য বড় ধরনের ব্যয়ের চাপ নেওয়ার চেয়ে চীনের ব্যবস্থার সঙ্গে থেকে যাওয়াটাই সমীচীন মনে হবে।

কেন এই বিভাজন: আন্তর্জাতিক বিশ্নেষকদের মতে, ‘ক্লিন ইন্টারনেট’ নীতি গ্রহণের নেপথ্যে শুধু চীনের যন্ত্রপাতি ব্যবহারজনিত নিরাপত্তার ঝুঁকিই প্রাধান্য পাচ্ছে না। বরং বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বাজারে চীনের এক হুয়াওয়ের কাছেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর ক্রমাগত বাজার হারানোও বড় কারণ। ‘ক্লিন ইন্টারনেট’ নীতির মাধ্যমে উল্টাপথে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের কোম্পানিগুলোর বাজার পুনরুদ্ধারও করতে চাইছে।

আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্নেষণ করা শীর্ষ প্রতিষ্ঠান স্ট্যাটিস্টার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় এক দশমিক আট ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশ্ব টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক প্রযুক্তির বাজারে হুয়াওয়ের এককভাবে মার্কেট শেয়ার ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্য চীনা কোম্পানি জেডটিইর মার্কেট শেয়ার ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপীয় কোম্পানি নোকিয়ার মার্কেট শেয়ার ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ, এরিকসনের ১১ দশমিক ৭ শতাংশ, এনইসির ৩ দশমিক ৮ শতাংশ, মটোরোলার ৩ দশমিক ৬ শতাংশ, সিসকোর ৩ দশমিক ২ শতাংশ এবং অন্যান্য কোম্পানির ১৯ শতাংশ।

এই পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে, চীনের হুয়াওয়ে কীভাবে বিশ্ব টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক বাজারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোকে অস্তিত্ব সংকটে ফেলে দিয়েছে। কম মূল্যে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রযুক্তি পণ্য সরবরাহ, সহজ শর্তে বিক্রয়োত্তর সেবার পাশাপাশি নতুন উদ্ভাবন এবং দেশে দেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দক্ষ জনবল তৈরির কর্মসূচি হুয়াওয়েকে দ্রুতই পশ্চিমা কোম্পানিগুলো থেকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছে। পরিস্থিতি এমন যে, ইউরোনিউজের সাম্প্রতিক বিশ্নেষণে বলা হয়েছে, টুজি থেকে ফোরজিতে হুয়াওয়ে বাজার দখলে মরিয়া হয়ে ছুটেছে, আর ফাইভজিতে সবাই ছুটবে হুয়াওয়ের পেছনে, কারণ ফাইভজি নেটওয়ার্কে হুয়াওয়ের সম্ভাব্য মার্কেট শেয়ার হবে ৮০ শতাংশ! এ অবস্থায় চীনা প্রযুক্তি নয়, শুধু হুয়াওয়েকে ঠেকিয়ে রেখে পশ্চিমা কোম্পানিগুলোকে বাঁচাতেই নেওয়া হয়েছে ‘ক্লিন ইন্টারনেট’ নীতি!

ইউরোনিউজের বিশ্নেষণে অবশ্য এটাও বলা হয়েছে, ইন্টারনেট ব্যবস্থা দ্বিখণ্ডিত করাটা হবে এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। এ ধরনের ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষেত্রে বাইডেন প্রশাসন ভিন্নভাবে চিন্তা করবে বলেই তাদের ধারণা।

কী ভাবছে বাংলাদেশ: সংশ্নিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ইকো সিস্টেমে হুয়াওয়ের এককভাবে মার্কেট শেয়ার প্রায় ৭০ শতাংশ। একই সঙ্গে ফোর টায়ার ডাটা সেন্টারসহ তথ্যপ্রযুক্তি খাতও নির্ভরশীল চীনা প্রযুক্তি পণ্যের ওপর। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ‘ক্লিন ইন্টারনেট’ নীতি বাস্তবায়ন করলে দ্বিখণ্ডিত বিশ্ব ইন্টারনেট ব্যবস্থার সামনে কী পদক্ষেপ নেবে বাংলাদেশ? এমন প্রশ্নে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সমকালকে বলেন, পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র। অতএব কোন প্রযুক্তি কিংবা কোন দেশের প্রযুক্তি নেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করবে বাংলাদেশই। তবে একটা বিষয় পরিস্কার, বর্তমান বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে বিশ্ব ইন্টারনেট ব্যবস্থাকে দ্বিখণ্ডিত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হবে না। কারণ ইউরোপ, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও টেলিযোগাযোগ ইকো সিস্টেমে হুয়াওয়ের সুস্পষ্ট অবস্থান রয়েছে। সেখানে তারা অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। বিশেষ করে ইউরোপের অনেক দেশ ফাইভজির জন্যও হুয়াওয়েকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টও পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে বর্তমান বাস্তবতায় শেষ পর্যন্ত দ্বিখণ্ডিত ব্যবস্থা বিশ্বকে দেখতে হবে না, এটাই প্রত্যাশা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *